এখনো বেড়িবাঁধে বসবাস

www.risingbd.com
25 May 2016   01:40:30 PM
———————————-
মুহাম্মদ নূরুজ্জামান, খুলনা : দক্ষিণাঞ্চলবাসীর কাছে মূর্তিমান আতঙ্ক হয়ে আছে ভয়াল সাইক্লোন আইলা। দীর্ঘ সাত বছর আগে ২৫ মে আইলার আঘাতে লন্ডভন্ড হয়ে যায় সবকিছু। এখন পর্যন্ত আইলাবিধ্বস্ত উপকূলবাসীর দিন-রাত কাটছে সেই বেড়িবাঁধের ওপর। এখনও নিশ্চিত করা যায়নি তাদের মাথাগোঁজার সামান্য ঠাঁই টুকুও।

এখনও খুলনার কয়রা উপজেলার উত্তর বেদকাশী, মহারাজপুর এবং দাকোপ উপজেলার কামারখোলা ও সুতারখালী ইউনিয়নের প্রায় সাড়ে ৩ হাজার মানুষ বেড়িবাঁধের উপরে বাস করছেন। অন্যদিকে আইলার পরে জরুরি ভিত্তিতে যে বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়েছিলো সেগুলোও মানসম্মত উপায়ে তৈরি করা হয়নি। ইতিমধ্যে বর্ষা মৌসুম এসে পড়েছে। ফলে উপকূলবাসী নতুন আতঙ্কে রয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানান, ২০০৯ সালের আইলার আঘাতে এখানে ১৯৩ জনের মৃত্যু হয়, ৭ হাজার মানুষ আহত হন, সাড়ে ৬ হাজার গরু-বাছুর ও প্রায় ২ লাখ হাঁসমুরগি মারা যায়। উপকূলের ১১টি জেলায় প্রায় ৬ লাখ ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়, ৮ হাজার ৮শ’ কিলোমিটার রাস্তাঘাট ভেঙে যায়। খুলনা ও সাতক্ষীরা এই দুই জেলাতেই ৭১০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ভেঙে প্রায় দেড় লাখ একর জমি নোনাপানিতে তলিয়ে যায়। ফলে এ দুটি জেলার প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার মানুষ স্থায়ীভাবে এবং প্রায় সাড়ে ৪ লাখ মানুষ অস্থায়ীভাবে বাস্তচ্যুত হয়ে পড়েন।

ঘুর্ণিঝড় আইলার প্রভাবে সেদিন সকাল সাড়ে সাতটার দিকে নদীতে জোয়ারের পানি বিদ্যুৎ বেগে বৃদ্ধি পেয়ে বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয়ে হু হু করে লোনা পানি  প্রবেশ করে। মুহুর্তের মধ্যে মানুষের ঘরবাড়ি, চিংড়ি ঘের, ক্ষেত খামার, রাস্তাঘাট সবই পানিতে একাকার হয়ে যায়। হাজার হাজার নারী, পুরুষ, শিশু, গবাদিপশু সাইক্লোন শেল্টারে গিয়ে আশ্রয় নেয়। শত শত পরিবার ঘর ছেড়ে খোলা আকাশের নিচে বেড়িবাঁধের ওপর আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। আইলার জলোচ্ছাসে কয়রায় ৯ ব্যক্তি প্রাণ হারায়। ২৪টি পয়েন্টে বেড়িবাঁধ ভেঙে যায়। কয়রায় হারেজখালি, পদ্মপুকুর, মঠবাড়ি, পাথরখালি, আশাশুনির চাকলা, রুইয়ারবিল, দাকোপের গোলবুনি, সুতারখালি, গুনারি, শ্যামনগরের গাবুরা, বুড়িগোয়ালিনী বেড়িবাঁধ বিধ্বস্ত হয়ে দু’ বছর লোনা পানিতে তলিয়ে থাকে খুলনা-সাতক্ষীরা উপকূলের বিস্তীর্ন জনপদ।

মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত মঠবাড়ি ক্লোজার, হারেজখালি, পদ্মপুকুর, পাথরখালি, গোলবুনি ক্লোজার তিন বছর পর ২০১২ সালে সেনাবাহিনীর ততা¡বধানে পানি উন্নয়ন বোর্ড মেরামত করতে সক্ষম হয়। আজো কয়রা এলাকার মানুষ আইলার ধকল পুরোপুরি সামলে উঠতে পারেনি। পাউবোর বাঁধ প্রতিনিয়তই ভাঙছে। ভাঙনের কবলে পড়ে ভিটেমাটি হারাচ্ছে মানুষ।

পাউবোর বেড়িবাঁধ মেরামত প্রসঙ্গে খুলনাঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোঃ বজলুর রশিদ বলেন, ষাটের দশকে নির্মিত উপকূলীয় এলাকার বেড়িবাঁধগুলো ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে নিচু হয়ে গেছে। পর্যাপ্ত অর্থের অভাবে পাউবো বাঁধ মেরামত করতে হিমশিম খাচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বেড়িবাঁধের কিছুটা অংশে ড্যাম্পিং করে ব্লক বসানো হয়েছে। নদী ভাঙন ঠেকাতে জাইকার অর্থায়নে আগামী বছর থেকে বেড়িবাঁধে ব্লক বসানো কার্যক্রম শুরু হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. বদিউজ্জামান বলেন, সাত বছর আগের আইলার ক্ষতি ইতিমধ্যে মানুষ কাটিয়ে উঠে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় বেশি বেশি বরাদ্দ দেওয়ায় উন্নয়ন কার্যক্রম এগিয়ে চলেছে। নদীভাঙন রোধে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণে জেলা প্রশাসককে অবহিত করা হয়েছে।

এদিকে, আইলার সপ্তম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে বুধবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দিনব্যাপী খুলনা প্রেস ক্লাব চত্বরে চলছে আইলার ভয়াল দৃশ্য সম্বলিত আলোকচিত্র প্রদর্শনী। বেসরকারি সংগঠন গ্রামীণ জীবনযাত্রার স্থায়িত্বশীল উন্নয়নের জন্য প্রচারাভিযান (সিএসআরএল) ও এর সদস্য সংগঠনের পক্ষ থেকে এ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে ক্লিন’র প্রধান নির্বাহী হাসান মেহেদী বলেন, ‘দুর্গত জনগোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিত করার জন্য একটি আইন হয়েছে। কিন্তু শুধুমাত্র দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর গঠন ছাড়া আইনটি দীর্ঘ ৪ বছরেও কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। তিনি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দুর্যোগে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা ও সম্পদ রক্ষার জন্য অবিলম্বে প্রয়োজনীয় বিধিমালা ও দাপ্তরিক আদেশ জারি করে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইনটি কার্যকর করার দাবি জানান হাসান মেহেদী ।

এ ছাড়া আইলায় ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি হারানো পরিবারগুলোকে খাসজমি বিতরণ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দিয়ে পুনর্বাসন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন কার্যকর করার পূর্ব পর্যন্ত বেড়িবাঁধ কাটা ও ছিদ্র করার বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি থেকে উপকূলীয় জনগোষ্ঠীকে রক্ষায় বেড়িবাঁধগুলো শক্তিশালী করণ এবং উপকূলীয় অঞ্চলে যে কোনো কর্মসূচি গ্রহণের ক্ষেত্রে ‘সমন্বিত উপকূলীয় ব্যবস্থাপনা নীতি অনুসরণ বাধ্যতামূলক করারও দাবি জানান তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>