কয়রা ও দাকোপের বেড়িবাঁধে সাড়ে ৩ হাজার মানুষের বসবাস!

Daily Probaho, Khulna
 মুহাম্মদ নূরুজ্জামান, 26 May 2016
———————————–
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলবাসীর কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে ভয়াল সাইক্লোন আইলা। ২০০৯ সালের ২৫ মে এ ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে। এতে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় সবকিছু। আজ আইলা’র সপ্তম বর্ষপূর্তি। কিন্তু এখন পর্যন্ত আইলা বিধ্বস্ত উপকূলবাসীর দিন-রাত কাটছে সেই বেড়িবাঁধের ওপর। এখনও নিশ্চিত করা যায়নি তাদের মাথা গোঁজার সামান্য ঠাঁইটুকুও। কয়রার উত্তর বেদকাশী, মহারাজপুর এবং দাকোপের কামারখোলা ও সূতারখালী ইউনিয়নের প্রায় সাড়ে ৩ হাজার মানুষ এখনও বেড়িবাঁধের ওপরে বাস করছেন। কারণ আইলার সময় তাদের ঘরবাড়ি-জমিজমা সব বিলীন হয়। নিজস্ব কোনো জমি না থাকায় তারা সরকারের গৃহনির্মাণ তহবিলের সহায়তাও পাননি। এমনকি তাদেরকে কোনো খাস জমিও বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। আইলার পরে জরুরি ভিত্তিতে যে বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়েছিলো সেগুলোও মানসম্মত উপায়ে তৈরি করা হয়নি। ইতোমধ্যে বর্ষা মৌসুম শুরু হয়ে গেছে। ফলে উপকূলবাসী নতুন আতংকে রয়েছেন।

২০০৯ সালের ২৫ মে ঘূর্ণিঝড় আইলা আঘাত হানে। উপকূলের ১১টি জেলায় প্রায় ৬ লাখ ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়, ৮ হাজার ৮শ কিলোমিটার রাস্তাঘাট ভেঙে যায়। খুলনা ও সাতক্ষীরার ৭১০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ভেঙে প্রায় দেড় লাখ একর জমি নোনা পানিতে তলিয়ে যায়। ঘূর্ণিঝড় আইলা আঘাত হানার পর ইতোমধ্যেই বঙ্গোপসাগরে লায়লা, গিরি, হুদহুদ, নিলোফার, নার্গিস ইত্যাদি নামের ১৭টি ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়। মহাসেন ও কোমেন ছাড়া এ অঞ্চলে কোন ঝড় আঘাত হানেনি। ২০১৩ সালে ঘূর্ণিঝড় মহাসেন মধ্য উপকূলীয় অঞ্চলে আঘাত হানলে ১২ জন এবং ২০১৫ সালে ঘূর্ণিঝড় কোমেন-এর আঘাতে ৪ জনের মৃত্যু হয়। সর্বশেষ আইলার ৭ বছর পর গত ২১ মে ঘূর্ণিঝড় রোয়ানু দুর্বল হয়ে মধ্য ও পূর্ব উপকূলীয় এলাকায় আঘাত হানে। এতে ঝরে যায় ২৪টি প্রাণ। ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রায় ২ লাখ মানুষ। এবারও অন্তত ৮শ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে, লোনা পানিতে প্লাবিত হয়েছে ১ লাখ একর ফসলি জমি। এ ঘূর্ণিঝড় খুলনা-সাতক্ষীরা-বাগেরহাটে আঘাত না হানলেও কমপক্ষে ৬টি স্থানে বেড়িবাঁধে ফাঁটল ধরেছে। এছাড়া খুলনার ৪ নম্বর কয়রা, মহারাজপুর ও কালাবগীতে জলোচ্ছ্বাসের পানি বেড়িবাঁধ উপচে পড়ার উপক্রম হয়।

এদিকে, আইলা’র সপ্তম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে মঙ্গলবার দুপুর ১২টায় খুলনা প্রেস ক্লাবের সাংবাদিক মানিক সাহা অভ্যর্থনা কক্ষে বেসরকারি সংগঠন গ্রামীণ জীবনযাত্রার স্থায়িত্বশীল উন্নয়নের জন্য প্রচারাভিযান (সিএসআরএল) ও এর সদস্য সংগঠনের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সংবাদ সম্মেলন থেকে আইলা বিধ্বস্ত অধিবাসী এবং তাদের এলাকার উন্নয়নের লক্ষ্যে ৬ দফা দাবি তুলে ধরা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন উপকূলীয় জীবনযাত্রা ও পরিবেশ কর্মজোট (ক্লিন)’র প্রধান নির্বাহী হাসান মেহেদী। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, দুর্গত জনগোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিত করার জন্য একটি আইন হয়েছে। কিন্তু আইনটি দীর্ঘ ৪ বছরেও কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। সংবাদ সম্মেলনে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দুর্যোগে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জীবন, জীবিকা ও সম্পদ রক্ষার জন্য সরকারের কাছে ৬টি দাবি তুলে ধরা হয়। দাবির মধ্যে রয়েছে- অবিলম্বে প্রয়োজনীয় বিধিমালা ও দাপ্তরিক আদেশ জারি করে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইনটি কার্যকরকরণ, আইলায় ক্ষতিগ্রস্ত ও ভূমি হারানো পরিবারগুলোকে খাসজমি বিতরণ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দিয়ে পুনর্বাসন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন কার্যকর করার পূর্ব পর্যন্ত বেড়িবাঁধ কাটা ও ছিদ্র করার বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি থেকে উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা রক্ষায় বেড়িবাঁধগুলো পরিবেশসম্মত ও শক্তিশালীকরণ, উপকূলীয় কৃষি ও জীবনযাত্রা রক্ষায় অপরিকল্পিত নোনাপানির চিংড়ি ঘের বন্ধকরণ এবং উপকূলীয় অঞ্চলে যে কোনো কর্মসূচি গ্রহণের ক্ষেত্রে ‘সমন্বিত উপকূলীয় ব্যবস্থাপনা নীতি অনুসরণ বাধ্যতামূলক করতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে বেলার মাহফুজুর রহমান মুকুল, ক্লিন এর সভাপতি সাজ্জাদুর রহিম পান্থ, এওসেড এর শামীম আরেফিন, পরিবর্তনের প্রধান নাজমুল আজম ডেভিড, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির জিল্লুর রহমান ও মনিরুল হক বাচ্চু উপস্থিত ছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>