তেলের ট্যাঙ্কার তীরে, খোঁজ নেই মাস্টারের : শ্যালা নদীতে নৌযান বন্ধের নির্দেশ, আপাতত স্থানীয়রা সরাবে তেল

Subir Roy, Daily Ajker Patrika
12 December 2014
————————————-
অবশেষে দু’দিন পর টেনে তীরে তোলো হয়েছে শ্যালা নদীতে ডুবে যাওয়া তেলের ট্যাঙ্কার সাউদার্ন স্টার সেভেন। মালিকপক্ষ মেসার্স হারুন অ্যান্ড কোম্পানির ভাড়া করা ৩টি উদ্ধারকারী নৌযানের সহায়তায় ট্যাঙ্কারটি টেনে প্রথমে নদীর চরে সরিয়ে নেয়া হয়। পরে সেখান থেকে মংলার জয়মনিরঘোল এলাকায় রাখা হয়। তবে নিখোঁজের দুই দিনেও খোঁজ মেলেনি সাউদার্ন স্টার সেভেন ট্যাঙ্কারের মাস্টার মোকলেসুর রহমানের। সুন্দরবন চ্যানেল বাদ দিয়ে বিকল্প চ্যানেলে নৌযান চলাচলের নির্দেশ দিয়েছে বিআইডব্লিউটিএ। এদিকে নদীতে ছড়িয়ে পড়া তেল অপসারণে চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা জাহাজ কাণ্ডারি-১০ মংলায় পৌঁছেছে। আপাতত স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় তেল উত্তোলন করা হবে। পরে বাকি তেল অপসারণে কাজ করবে কাণ্ডারি-১০।মংলার মেসার্স খানজাহান আলী স্যালভেজের ডুবুরি দল ডুবন্ত ট্যাঙ্কারের সঙ্গে লোহার তার পেঁচিয়ে গতকাল সকাল থেকে তীরে টেনে আনার কাজ শুরু করে। ট্যাঙ্কারটি টেনে তুলতে বিআইডব্লিউটিএর দু’টি উদ্ধারকারী জাহাজ আসার কথা থাকলেও সেগুলো ঘটনাস্থলে পৌঁছতে পারেনি।

বিআইডব্লিউটিএ চেয়ারম্যান সামসুদোহা খন্দকার বলেন, পুনরায় আদেশ না দেয়া পর্যন্ত শ্যালা নদী দিয়ে নৌযান চলাচল বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। নদীতে ভেসে থাকা তেল স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় সরিয়ে নেয়া হবে। তিনি বলেন, এ চ্যানেল ছাড়াও বিকল্প অনেক চ্যানেল আছে, সেগুলোতে একটু বেশি ঘুরতে হলেও সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এ সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। বন্দর কর্তৃপক্ষ, বনবিভাগ, বিপিসির সঙ্গে যৌথ সভা শেষে তিনি এ কথা বলেন। এদিকে খুলনা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে বিন্নি সংগঠনের নেতারা বলেছেন, বাংলাদেশের গর্বের ধন সুন্দরবন আজ হুমকির মুখে। এ অবস্থায় জরুরিভিত্তিতে তেল সরিয়ে নিতে উদোগ নেয়া দরকার। সরকার অবিলম্বে এ উদ্যোগ নিলে সুন্দরবন বিপন্নতার কবল থেকে রক্ষা পাবে। কিন্তু গত দুই দিনে সরকারের আন্তরিকতা চোখে পড়লেও জরুরি উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।

গতকাল নাগরিক সমাজের জোট ‘সুন্দরবন পর্যবেক্ষণ দল’ বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা), উপকূলীয় জীবনযাত্রা ও পরিবেশ কর্মজোট (ক্লিন), গ্রামীণ জীবনযাত্রার স্থায়িত্বশীল উন্নয়নের জন্য প্রচারাভিযান (সিএসআরএল), ইক্যুইটি অ্যান্ড জাস্টিস ওয়ার্কিং গ্রুপ, বাংলাদেশ (ইক্যুইটিবিডি), ফরেস্ট পিপলস প্রোগ্রাম (এফপিপি) ও ম্যানগ্রোভ অ্যাকশন প্রোজেক্ট (ম্যাপ) যৌথভাবে সংবাদ সম্মেলন করে। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন ক্লিনের প্রধান সঞ্চালক হাসান মেহেদী।সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা জানান, ২০০২ সালে বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগে তিনটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান সুন্দরবনে তেল-দূষণের সম্ভাব্য ক্ষতির বিষয়ে একটি সমীক্ষা চালায়। তেল-দূষণ থামানো না গেলে প্রথম ১৫ দিনের মধ্যে পাখি, কচ্ছপ, ছোট মাছ ও অমেরুদণ্ডীপ্রাণী মারা যেতে পারে বলে ওই সমীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়। এ ছাড়া প্রতিবেদনে তেল-দূষণ রোধ করার জন্য বন বিভাগের সক্ষমতা বৃদ্ধিসহ প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও উপকরণ ক্রয়, স্থানীয় জনগণ ও স্বেচ্ছাসেবীদের অংশগ্রহণে বাঁশ, কাঠের গুঁড়ি, কাঁচাপাট, খড়কুটো, বস্তা ও চট ব্যবহার করে দ্রুত উদ্যোগ নেয়ার সুপারিশও করা হয়েছিল। ওই প্রতিবেদনের পর এক যুগ পার হয়ে গেলেও কোনো প্রস্তুতি নেয়া হয়নি।

বক্তারা বলেন, দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া না হলে প্রাণবৈচিত্র্য ধ্বংস হওয়ার পাশাপাশি মানবদেহে দীর্ঘমেয়াদে ক্যান্সার, কিডনি ও যকৃত অকেজো হয়ে যাওয়া, স্নায়ূর স্থায়ী ক্ষতিসাধন, রক্তচাপ বেড়ে যাওয়া এবং রক্তের তারল্য বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে বিপন্ন প্রাণীর অভয়াশ্রমকে নিরাপদ রাখার জন্য কোনো ধরনের রাসায়নিক পাউডার ব্যবহারের প্রতিবাদ জানানো হয়। বক্তারা বলেন, কোনো রাসায়নিক দ্রব্যের মাধ্যমে তেল অপসারণ করলে কিংবা বনের ভেতরে ঢুকে তেল দূরীভূত করার চেষ্টা করলে তা হবে আত্মঘাতের শামিল। তেল দূরীভূত করার জন্য আগুন ধরালে তা সুন্দরবনে আগুন ছড়িয়ে দিতে পারে বলেও সতর্ক করেন। তেলভুক ব্যাকটেরিয়া ছড়ানোর পদ্ধতিকে কার্যকর হলেও বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য সেটি খরচবহুল হবে বলে বক্তারা অভিমত দেন। বক্তারা যত দ্রুত সম্ভব কয়েকশ তরুণ স্বেচ্ছাসেবী নিয়োগ করে দেশি উপকরণ দিয়ে তেল সরিয়ে নেয়ার আহ্বান জানান। বক্তারা জানান, ২০১১ সালের ২৪ নভেম্বর স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে নৌ-রুট বন্ধ করার নির্দেশ দেন। এরপর ২০১২ সালের ২১ আগস্ট পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে একই দাবি জানায়। কিন্তু নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় এ নির্দেশ ও অনুরোধের কোনো তোয়াক্কা করেনি।

বক্তারা অবিলম্বে সুন্দরবনে পরিবেশগত দুর্যোগ ঘোষণা, জরুরিভিত্তিতে সুন্দরবনের নদী ও খাল থেকে তেল অপসারণের জন্য সম্মিলিত সামরিক ও বেসামরিক বাহিনী এবং স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ, দায়ী ব্যক্তিদের গ্রেফতার ও কোম্পানির কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়, সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে নৌ-চলাচল স্থায়ীভাবে বন্ধ করা, তেল অপসারণের কাজ প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে সরাসরি তদারক করা ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও উপকরণ সংগ্রহে জরুরি ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান। সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন সুন্দরবন পর্যবেক্ষণ দলের আহ্বায়ক গৌরাঙ্গ নন্দী, বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) বিভাগীয় সমন্বয়কারী মাহফুজুর রহমান মুকুল, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) খুলনা সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার, জন উদ্যোগের খুলনা সমন্বয়কারী মহেন্দ্রনাথ সেন, হিউম্যানিটিওয়াচের নির্বাহী সদস্য পলাশ দাশ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>